একটি সভ্যতার পতন একদিনেই হয় না, এটা অতি দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া। সভ্যতা গড়তে, বিকশিত হতে যেমন সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ঠিক একইভাবে একটা সভ্যতার বিকাশ থমকে যাওয়া, এক সময়ের প্রতাপশালী সভ্যতার প্রভাব, প্রতিপত্তি আর জৌলুস ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে পতন হতেও অনেক সময়ের প্রয়োজন। যে সময়টা হুট্ করে দেখে বোঝা যায় না, উল্টো এমন উপলব্ধি আসে যে আরে ওরা তো ভালোই আছে। অন্য সভ্যতার মধ্যে যারা ঐ সভ্যতার মতন জীবনযাপন করতে চায় তাদের মতে, "যদিও কিছু ত্রুটি আছে তবুও শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, প্রাচুর্যে তো ওরাই এগিয়ে"। কিন্তু এই যে তুচ্ছজ্ঞান করা কিছু ত্রুটি , অপরাধ কিংবা অবক্ষয় , একসময় এসকল ব্যাপারই পুরো সভ্যতাকেই নিচিহ্ন করে দিতে যথেষ্ট।
পূর্ববর্তী যেকোনো বড় সভ্যতার পতনের আগে সকল দিক দিয়ে পার্থিব সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করে। হয়ে উঠে অপ্রতিদ্বন্দী, প্রচন্ড প্রতাপশালী, অহংকারী এবং অতি আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু এতে করে সে তার স্থিতিশীলতা হারায়। একটা সভ্যতার বিকাশ তখনই হয় যখন তার বিকশিত হওয়ার লক্ষ্য থাকে। সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজের সকল কাঠামো যেনো যথাযথভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকে। কিন্তু একটা জাতি সমগ্র দুনিয়ার সফল হিসেবে অধিস্থিত হয়েছে, তাদের আদর্শকে অন্যরা নিজেদের উন্নতির জন্য আদর্শ হিসেবে ধরা শুরু করেছে। তখনি আস্তে আস্তে শুরু হয় ভাঙ্গনের সুর।
সমৃদ্ধশালী, ক্ষমতাধর সমাজ ধীরে ধীরে পুরোটাই ভোগবাদী আর দাম্ভিক হয়ে উঠে। যেহেতু চারদিকে সম্পদের প্রচুর প্রাচুর্য, আভিজাত্যের চকককে আবরণে মোড়ানো আর নান্দনিকতায় ভরপুর সমাজ ব্যবস্থা তাই তারা ধীরে ধীরে ত্যাগের বিপরীতে ভোগবাদীতা প্রচন্ড শক্তিশালী হয়ে উঠে। আর এই ভোগবাদিতাই সৃষ্টি করে বিষফোঁড়া। প্রচন্ড প্রতাপশালী হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে ধীরে ধীরে পতনের পথে পা বাড়ায়।
একটা সভ্যতার আরম্ভ, বিকাশ বা পতনের সম্ভাবনার যত ত্বাত্তিক কথা বার্তা রয়েছে তা পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যে পুরোপুরি দেখা যায়। সম্পদ, ক্ষমতা, অভিজাত্যে তারা অনেকের চোখে সেরা সভ্যতা, সেরা জাতি। কিন্তু তাদের মাঝে অতিমাত্রায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, অতিমাত্রায় স্বাধীনচেতা মনোভাব, সুনির্দিষ্ট আদর্শ অনুকরণের অভাবে তাদেরকে ভীষণরকম মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতো সব সুবিধা, সম্পদের পরও তাদের মনে শান্তি নেই, আত্মপরিচয়হীনতায় ভুগছে। মাঝে মধ্যে নিজেদের মনের মধ্যে সব কিছু চুরমার হয়ে যাচ্ছে ফলে তারা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। তারা এতটাই স্বাধীনচেতা যে নিজেদের মন মতন মরার স্বাধীনতা চায় রাষ্ট্র যেহেতু তাদের সকল কথা শুনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাই অনেক রাষ্ট্র আত্মহননের বৈধ অনুমোদন দিয়েছে।
অথচ এটা কখনোই হওয়ার কথা ছিল না যে, একটা মানুষ তার স্বাধীনতার বয়ানে সমাজের অন্যায়কে সমর্থন করবে। পাপ কে পাপ না বলে পাপ করার অনুমতি চাইবে। পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে তাদের যৌন বিকৃত। পূর্ববর্তী পতিত সভ্যতার ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায়। প্রচুর অর্থ সম্পদ তাদেরকে ভোগ বিলাসী বানিয়েছিলো এরপর ধীরে ধীরে তাদের মূল্যবোধ হ্রাস পেতে থাকে। বিবাহের মাধ্যমে সুস্থ ও বৈধ যৌনতা কে পরিহার করে তারা যিনা ও পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। (পশ্চিমাদের গড়ে প্রায় ৫০% সন্তান জারজ) তখন তাদের কাছে বিয়ের মূল্য থাকে না। পরিবারের মূল্য থাকে না। ফলে সন্তান সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পরিবারে বেড়ে উঠার যে প্রক্রিয়া তা ব্যাহত হয়।
ধীরে ধীরে এই অবাধ যৌনতা শুধু যিনা ব্যাভিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ নতুনত্ব চায় ফলে সে অসংখ্য বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌন সম্পর্কের সুযোগ বাদ দিয়ে (পশ্চিমাদের প্রতিজনের গড়ে প্রায় ৭-৮ জন ভিন্ন যৌনসঙ্গী থাকে সারাজীবনে ) সময় লিঙ্গের বা উভলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এটাকে বৈধতা উৎপাদনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়। এটা শুধু আজকের পশ্চিমা সভ্যতায় না। প্রাচীন সামুদ জাতি কিংবা রোমান সভ্যতায় পম্পেও নগরীতেও একই ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে অবাধ যিনা ব্যাভিচার এরপর তা ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে সমকামিতায় পরিণত হয় যার ফলে আল্লাহ এই দুই নগরীকে আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন। একই পরিণতি আমরা দেখতে পারি পশ্চিমা সভ্যতায়। আজ কেউ সমকামিতাকে ঘৃণা করলেই যেনো মস্ত বড় অপরাধ করে ফেলেছে। কেউ জীবনে যায় করুক সমকামিতাকে বৈধতা দিতেই হবে। আয়োজন করে প্রাইড মান্থ পালন করতেই হবে।
পশ্চিমাদের যৌনতা শুধু সমকামিতার থেমে থাকেনি অনেকে শিশুকাম, পশুকাম এমনকি মৃতমানুষের সাথে যৌনতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ তাদের মানবিক মূল্যবোধ, সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে তাদের সমাজের একটা বড় অংশ অমানুষে পরিণত হয়েছে। যেহেতু অনেক আগে থেকেই তাদের মধ্যে পরিবার গঠনের চিন্তা ভাবনা কম, বিবাহ বহির্ভুত একাধিক সম্পর্ক করেই জীবন পার করে দেওয়ার মতন অবস্থা। তাই দুই থেকে তিন প্রজন্ম সৃষ্টি হয়ে গেছে যাদের অর্ধেকের বৈধ বাবা বা মা নেই। এমনকি অনেক সময় মেয়েরা এটাও জানে না যে তার সন্তান সুনির্দিষ্ট কোন পুরুষের সাথে মিলনের ফলে জন্মগ্রহণ করেছে। ফলে সন্তানের না থাকে কোনো পিতৃ পরিচয়, না পায় একটা সুস্থ পরিবার। ফলে সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশ জন্মের পর থেকেই ব্যাপক ব্যাহত হয় এবং নিজেও বিকৃত এইটা সিস্টেমে ঢুকে পরে।
অন্যদিকে সারাজীবন সঙ্গী পরিবর্তণ করে আসা নারী ও পুরুষগণের শেষ পর্যন্ত কোনো সঙ্গী থাকে না সাধারণত শেষ বয়সে। আবার তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পরিবার নামক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার কারণে একদিকে যেমন সন্তানরা পরিবারের আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয় আবার শেষ বয়সে সন্তানরাও বাবা মার সেবা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। তাই সারাজীবন স্বেচ্ছাচারিতা, অবাধ যৌনতা কিংবা সমকামিতার সাফাই গাওয়া প্রগতিশীলদের শেষ বেলায় জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা একাকিত্বের ধুম্রজালে ঢুকে ঢুকে মরণের সাথে লড়াই করে দুনিয়া থেকে জঞ্জাল মুক্ত হয়।
উপরের সব আলোকনায় এটা নিশ্চিত যে পশ্চিম সভ্যতার পতন অনিবার্য। এটা এমন নয় যে তারা তাদের অর্ধ সম্পদ, ক্ষমতা বা দাপট হারিয়ে ফেলেছে বরং তারা এমনভাবে নিজেদের নৈতিক ও আদর্শিকভাবে নিজেদের কয়েক প্রজন্ম ধরে নষ্ট করেছে যে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।
Comments
Post a Comment