নুর (আলোকিত করে দেয়।) শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় একে সুরা নুর বলা হয়। এ সুরায় এমন আদব- শিষ্টাচার ও বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে, যা সমাজ-জীবনকে নুরানি ও এর অধিকাংশ বিধান সুরায় যেসব বিধান উল্লেখ করেছেন, নিয়ে তা উল্লেখ করা হল :
প্রথম ও দ্বিতীয় বিধান ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে। ব্যভিচারী নারী-পুরুষ যদি অবিবাহিত হয় তা হলে তাদের একশ বেত্রাঘাত করা হবে। আর যদি তারা বিবাহিত হয় তা হলে তাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা।
তৃতীয় বিধানটি অপবাদ সংক্রান্ত। যদি কেউ কোনো বিবেকবান প্রাপ্তবয়স্ক পবিত্র চরিত্রের অধিকারী পুরুষ কিংবা নারীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে তা হলে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।
চতুর্থ বিধানটি স্বামী-স্ত্রীর জন্য। স্বামী যদি স্ত্রীর উপর অপবাদ আরোপ করে; এবং তার নিকট যদি চারজন সাক্ষী না থাকে তা হলে একে অপরের উপর লানত করবে। এরপর তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো হবে।
পঞ্চম বিধানটিতে ইফকের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। ইফক অর্থ মিথ্যা অপবাদ। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উপর কিছু মুনাফিক যখন অপবাদ আরোপ করে, তখন এ বিধান অবতীর্ণ হয়। এটা এক জঘন্য অপবাদ ছিল, সব ব্যক্তি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রী, মুসলমানদের মায়ের উপর না আরোপ করা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা দশ আয়াতে এসব আয়াতে মুনাফিকদের নিন্দা করা হয়। মুসলমানদের সতর্ক করা হয় ভবিষ্যতে কখনো যেন তারা এ ধরনের অপবাদে কোনোভাবে অংশগ্রহণ না করে।
ষষ্ঠ বিধানটি ঘরে প্রবেশের অনুনতি ও আদব সংক্রান্ত। বলা হয়েছে, কারো ঘরে। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করবে না। প্রবেশের পূর্বে সালাম দেবে।
সপ্তম বিধানটি মুমিন নারীদের সম্পর্কে। বলা হয়েছে, তারা যেন নিজেদের অবনত রাখে। লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কারো সামনে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, শুধু মাত্র মাহরাম ব্যতীত।
অষ্টম বিধান দেওয়া হয়েছে, স্বাধীন নারী-পুরুষ ও গোলামদের মধ্যে যারা বৈবাহিক অধিকার আদায়ে সক্ষম তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া। এ ছাড়াও বাদিদের বিয়ে দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
নবম বিধান দেওয়া হয়েছে বাদি ও গোলামদের ব্যাপারে। ইসলাম আসার পূর্বেই যুদ্ধবন্দিদের গোলাম বানানোর প্রচলন ছিল। গোলাম বাদিদের উপর সীমাহীন জুলুন করা হতো। ইসলাম এ প্রথাতে বহু পরিবর্তন এনেছে। গোলাম-বাদিদের উপর নির্যাতনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যান্য মানুষের মতো তাদের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। তাদের আজাদ করে দেওয়াকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ বলে উল্লেখ করেছে।
দশম বিধান, কিছু অসাধু লোভী ব্যক্তি বাঁদিদের টাকার বিনিময়ে ব্যভিচার করতে বাধ্য করত। এটাকে তারা পেশা বানিয়ে নিয়েছিল। আয়াতে এমনটি করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, বাঁদিরা যদি স্বেচ্ছায় এমনটা করতে আগ্রহী হয় তা হলে তা জায়েজ হয়ে যাবে; বরং স্বেচ্ছা-অনিচ্ছা উভয় ক্ষেত্রেই তা হারাম। আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঁদি হওয়া সত্ত্বেও সে যখন এই কাজের প্রতি ঘৃণাবোধ করে তা হলে তোমাদের স্বাধীনদের তো আরো আগে ঘৃণা পোষণ করা উচিত ছিল।
দশটি বিধান ও আদব উল্লেখ করার পর তিনটি উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম উদাহরণ মুমিনদের জন্য। দ্বিতীয় ও তৃতীয় উদাহরণ বাতিলপন্থিদের উদ্দেশ্যে। প্রথম উদাহরণে মুমিনদের অন্তরের নুরকে প্রদীপের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যে প্রদীপটি একটি কাঁচপাত্রে স্থাপিত। কাঁচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্রসদৃশ্য। তাতে বরকতপূর্ণ যায়তুন বৃক্ষের তেল প্রজ্বলিত হয়, যা পূর্বমুখীও নয় এবং পশ্চিমমুখীও নয়। আগুন স্পর্শ না করলেও তার তেল যেন আলোকিত হয়।
বাতিলপন্থিদের দুটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টান্তে তাদের আমলের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, যারা কাফের, তাদের কাজ মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়, । পিপাসার্ত ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে। সে যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না; বরং সেখানে আল্লাহকে পায়। অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে আখেরাতের প্রতি তাদের আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, (তাদের কার্যাবলি) প্রমত্ত সাগরের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, তরঙ্গের উপর তরঙ্গ যাকে উদ্বেলিত করে, যার উপর ঘন কালো মেঘ রয়েছে। একের উপর এক অন্ধকার। হাত বের করলে তাও দেখতে পাওয়া যায় না। আসলে আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না তার কোনো জ্যোতিই নেই।
হক ও বাতিলপন্থিদের উদাহরণ বর্ণনা করার পর বিশ্বজগতে দিনরাতের পরিবর্তন বৃষ্টিবর্ষণ, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি, পাখির উড্ডয়ন এবং বিভিন্ন জীবজন্ত সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদের যে দলিল-প্রমাণ নিহিত রয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
তাওহিদের দলিল উল্লেখ করার পর মুমিন ও মুনাফিকদের সম্পর্কে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এরপর আরও তিনটি বিধান দেওয়া হয়েছে।
প্রথম বিধান: ছোট বাচ্চা এবং গৃহে অবস্থানকারীদের সম্পর্কে। তারা যেন ফজরের পূর্বে, দ্বিপ্রহরের সময় এবং ইশার নামাজের পর শয়নকক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে নেয়। কেননা এ তিন সময় মানুষ সাধারণত ঘুমের পোশাক পরিধান করে থাকে।
দ্বিতীয় বিধান: সন্তান যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্কের ন্যায় ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাকে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। যেভাবে সম্ভব— কাশি বা পায়ের আওয়াজ প্রভৃতির মাধ্যমে অনুমতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
তৃতীয় বিধান: বৃদ্ধ নারী—যাদের বিয়ের বয়স অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, তারা যদি পর্দার ক্ষেত্রে বাহ্যিক কাপড় খুলে রাখে তা হলে এতে কোনো সমস্যা নেই। পূর্বের দশটি বিধানের সাথে এ তিনটি বিধান মিলালে মোট ১৩টি বিধান ও আদবের কথা জানা যায়।
চোদ্দতম আদব, ঘরে প্রবেশের সময় তোমরা সালাম দেবে।
পনেরোতম আদব, যখন তোমরা পরামর্শ প্রভৃতির জন্য কোনো মজলিসে বসবে তখন অনুমতি ব্যতীত মজলিস থেকে উঠবে না।
ষোলতম আদব, তোমরা যেভাবে পরস্পরকে ডেকে থাকো, আল্লাহর রাসুলকে সেভাবে ডেকো না।
সুরার শেষে বলা হয়েছে, বিশ্বজগৎ আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা এবং তার জ্ঞানের অধীন। আল্লাহ সবার অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবগত। কেয়ামতের দিন সবাইকে তাদের আমলের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৮৩-১৮৯
Comments
Post a Comment