সবচেয়ে বড় নেয়ামত কোরআন
সুরাটি হরফে মুকাত্তায়াত—ত-সীন-মীম দ্বারা শুরু হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বড় নেয়ামত কোরআনের আলোচনা করা হয়েছে। কোরআনের বিধান উম্মতের নিকট পৌঁছানোর জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলেন। এমনকি তিনি এজন্য জীবনধ্বংসের ঝুঁকিও নিয়ে নিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে বিরোধীদের নিকট যখনই কোনো নসিহত ও হেদায়েত আসতো, তারা তা প্রত্যাখ্যান করত। আর এ প্রত্যাখ্যান করাকে তারা আবশ্যক দায়িত্ব মনে করত।
বিভিন্ন নবীর ঘটনা
এক. এরপর এ সুরায় বিভিন্ন নবীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাকে নবুওয়াত প্রদান করে ফেরাউনের নিকট যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনার্থে প্রভুত্বের দাবিদার ফেরাউনের নিকট যান। তখন তার ও ফেরাউনের মাঝে যে আলোচনা সংঘটিত হয় এ সুরায় তার কিয়দংশ তুলে ধরা হয়েছে।
ফেরাউন প্রথমে উলটাপালটা কথা বলেছে। কিন্তু মুসা আলাইহিস সালাম সে রাব্বুল আলামিনের পরিচয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। এরপর সে কঠোর হয়ে যায়। মুসা আলাইহিস সালামের নিকট মুজিজা দেখতে চায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মাটিতে লাঠি ফেলেন। তা এক বিশাল সাপে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কাপড় থেকে হাত বের করেন, আর তা সূর্যের মতো চমকাতে থাকে।
এর ফলে ফেরাউন ও তার দরবারিদের চোখে ধাঁধা লেগে যায়। এই মুজিজাকে তারা জাদু বলে উড়িয়ে দেয়। তাকে অপমানিত করার জন্য মিসরের নামিদামি জাদুকরদের সে একত্র করে। মিসরবাসীদের বার্ষিক আনন্দ ও ঈদের দিন এক বিশাল মাঠে লক্ষ জনতার সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। জাদুকরদের ফেলানো রশি ও লাঠিগুলো সাপের মতো দেখাচ্ছিল। আর মুসা আলাইহিস সালাম যখন তার লাঠি নিক্ষেপ করেন তখন তা সব জাদুর সাপ গিলে ফেলে। গোটা ময়দান পরিষ্কার হয়ে যায়।
জাদুকররা বাস্তবতা বুঝে ফেলে। তৎক্ষণাৎ তারা রাব্বুল আলামিনের দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। ফেরাউনের হুমকি-ধমকি সত্ত্বেও তারা ঈমানের উপর অটল থাকে। মুসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাইলকে নিয়ে রাতের আঁধারে মিসর থেকে বেরিয়ে যান। সকাল হলে ফেরাউন লক্ষ সৈন্যের বাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। পরিশেষে সে নদীর তীরে তাদের দেখতে পায়। বনি ইসরাইলের জন্য নদীর মাঝে রাস্তা হয়ে যায়। বনি ইসরাইল তা দিয়ে পার হয়ে যায়। ফেরাউন সে রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করতে গেলে লোকবলসহ ডুবে যায়। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, পরিশেষে সত্যের জয় হয় আর সবসময় জালেমদের ধ্বংস হয়।
দুই. এরপর ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা-বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। তার পিতা আজর ও তার সম্প্রদায় প্রতিমা পূজা করত। তিনি তাকে অত্যন্ত হেকমতের সাথে ঈমান ও তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি পাঁচটি দলিল এবং আল্লাহর পাঁচটি গুণের কথা উল্লেখ করেন।
এ পাঁচটি গুণ উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি পাঁচটি দোয়া করেন, যা তার ঈমানের পূর্ণতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।
১. হে আল্লাহ, আনাকে হেকমত ও প্রজ্ঞা দান করুন এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
২. পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমার সুনাম ছড়িয়ে দিন।
৩. জান্নাতে আমার জন্য একটি ঠিকানা দান করুন।
৪. আমার পিতাকে ক্ষমা করে দিন (যখন তার পিতা কুফরের উপর থাকার বিষয়টি তার নিকট স্পষ্ট ছিল না তখন তিনি এই দোয়া করেছিলেন)।
৫. দয়া করে আমাকে আখেরাতে আমাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করবেন না।
তিন
এরপর নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি স্বীয় সম্প্রদায়কে সাড়ে নয়শত বছর ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু তারা দাওয়াত কবুল করেনি তারা। এই কারণে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি আল্লাহ যাকে চান সে-ই কেবল হেদায়েত পেতে পারে।
চার.
এরপর চতুর্থ পর্যায়ে হজরত হুদ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি আদ সম্প্রদায়ের নিকট নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। শারীরিক শক্তি, সুদীর্ঘ বয়সকাল ও জীবনযাপনের দিক থেকে তারা পৃথিবীর এক অনন্য জাতি ছিল। প্রয়োজন ছাড়াই-বা বাহাদুরি দেখানোর উদ্দেশ্যে তারা বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করে রেখেছিল। তারাও ঈমানের দাওয়াত কবুল করেনি। তাই একসময় তাদের উপর আল্লাহর আজাব নেমে আসে। তাদের ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, অপচয়, ভোগ-বিলাস, প্রয়োজন ব্যতীত অট্টালিকা নির্মাণ এবং অহংকারের পরিণতি কখনো শুভ হয় না।
পাঁচ-
পঞ্চম পর্যায়ে হজরত সালেহ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তার সম্প্রদায় প্রাচার্যময় রিজিক, শান্তি-নিরাপত্তা ও বস্তাত বহু উপকরণের অধিকারী ছিল। তাদের সবুজ-শ্যামল বাগবাগিচা ছিল। কিন্তু তারা আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করেনি। তাই এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের মাধ্যমে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। অকৃতজ্ঞ জাতির পরিণাম এমনই হয়ে থাকে।
ছয়.
ষষ্ঠ পর্যায়ে হজরত লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা পাপাচার, অনাচার, প্রবৃত্তিপূজা ও অপকর্মের ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তারা এমন অপকর্মে লিপ্ত হতো ইতিপূর্বে, যা কেউ-ই করেনি। এমনকি চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারও একে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে থাকে। আকাশ থেকে তাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। পৃথিবী থেকে তাদের নাম-গন্ধ মুছে ফেলা হয়। অন্যান্য ঘটনার ন্যায় আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনারও শেষে বলেছেন, নিঃসন্দেহে এতে নিদর্শন রয়েছে। তাদের অধিকাংশই ঈমান আনয়নকারী ছিল না।
সাত,
সপ্তম পর্যায়ে শোয়াইব আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তার সম্প্রদায়কে আল্লাহ তায়ালা অনেক নেয়ামত দিয়েছিলেন। তাদের ঘন উদ্যান ছিল। ফল-ফলাদিতে পূর্ণ বাগান ছিল। মিঠা পানির ঝরনা ছিল। কিন্তু তারা আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।
তাদের প্রধান পাপাচার এটা ছিল যে, তারা বান্দার হক আদায়ে টালবাহানা করত। বোঝানোর পরেও যখন তারা বোঝেনি এবং বিরত থাকেনি তখন আল্লাহ তাদের ব্যাপারে আজাবের ফয়সালা করেন। কয়েকদিন প্রচণ্ড গরম পড়ে। এরপর তাদের আকাশ মেঘে ছেয়ে যায়। তারা ঠান্ডা অনুভব করার জন্য মেঘের নিচে একত্র হয়। কিন্তু মেঘ থেকে আগুন বর্ষিত হয়। জমিনে ভূকম্পন শুরু হয়। মুহূর্তেই তারা কয়লা হয়ে যায়।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৯২-১৯৬
Comments
Post a Comment