সুরা রুম
কোরআন মাজিদের মুজিজা হওয়ার একটি বিষয় হল তার ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ। এই সুরার শুরুতে এক ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীতে যা অক্ষরের অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল। রোমকদের বিষয় সম্পর্কে এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। ভবিষ্যদ্বাণীটি বাস্তবতি হওয়া এক অস্বাভাবিক বিষয় ছিল। কেননা কোরআন যখন এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, পারসিকরা তখন রোমকদের উপর পূর্ণরূপে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বসেছিল।
রোমান সাম্রাজ্য মৃত্যুর দুয়ারে উপনীত ছিল। সীমান্ত অত্যন্ত নাজুক হওয়ার পাশাপাশি ভেতরগত অবস্থাও ছিল খুব করুণ। ইউরোপের দিকে দিকে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছিল। রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস শোচনীয় পরাজয় মুহূর্তে লাঞ্ছনাকর সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিল।
যেহেতু তখন পারসিকরা মূর্তিপূজক ছিল আর রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করত এ কারণে মক্কার মুশরিকরা পারসিকদের বিজয়ের খবর শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এই অবস্থায় কোরআন ভবিষ্যদ্বাণী করে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রোমকরা পারসিকদের উপর বিজয়ী হবে।
সন্দেহ নেই কোরআনের ঘোষণা নিয়ে মুশরিকরা বহু ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে। কিন্তু ঠিক নয় বছরের মাথায় কোরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে। রোমকরা পারসিকদের সম্পদ ও ক্ষমতা নিজেদের পায়ের তলে নিয়ে আসে। তারা পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানীতে নিজেদের পতাকা উড্ডীন করে।
উল্লিখিত ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়াও সুরা রুমে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে নিম্নে তা উল্লেখ করা হল :
১. হিযবুর রহমান ও হিযবুশ শাইতানের মাঝে আদিকাল থেকে যে যুদ্ধ চলে আসছে, সুরা রুমে তার বাস্তবতা বলা হয়েছে। বিচার দিবস পর্যন্ত হক- বাতিলের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
২. এ সুরায় আল্লাহ তায়ালা স্বীয় একত্ব ও বড়ত্বের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি তার দলিল-প্রমাণও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা মৃত থেকে জীবিতকে সৃষ্টি করেন। তিনি স্বীয় ক্ষমতা-বলে বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি করেন। ডিম থেকে বাচ্চা, বীজ থেকে গাছ সৃষ্টি করেন। এর বিপরীতও ঘটে থাকে (যেমন জীবিত মুরগী থেকে ডিম)।তিনি মানুষকে প্রাণহীন মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আদম আলাইহিস সালামকে তিনি সরাসরি মাটি থেকে আর অন্যান্য মানুষকে পরোক্ষভাবে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। কেননা মানুষের যাবতীয় খাদ্য-খাবার মাটি থেকে উৎপন্ন হয় (খাবার থেকে বীর্য তৈরি হয়)।
স্বামী -স্ত্রীর মধ্যকার এমন মহব্বত ও সম্পর্ক তৈরি করে দেন যে, মনে হয় তারা একে অপরের শরীরের অংশ। অথচ বিয়ের পূর্বে তাদের মধ্যে কোনো ধরনের পরিচয়-পরিচিতিই ছিল না। আসমান, জমিন এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন।
তাদেরকে বহু ভাষা এবং বর্ণ-বৈচিত্র্য প্রদান করেছেন। কারও ভাষা আরবি। কারও ভাষা ফারসি, ইংরেজি, উরদু, জাপানিজ। কেউ কালো, আবার কেউ লাল।দিবারাত্রিতে ঘুমের মাধ্যমে মানুষের শান্তির ব্যবস্থা করেন। মানুষের দেহ এক মেশিনের ন্যায়। যদি ব্যস্ততার দরুন কখনো বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না ঘটে তা হলে মেশিনে সমস্যা দেখা দেয়।
আকাশে বিজলি চমকায়। এতে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার হয় আবার আশাও হয়। মৃত জমিন জীবিত হয়ে ওঠে। এরপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়। আসমান-জমিনের সুশৃঙ্গল ব্যবস্থা আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের জীবস্ত প্রমাণ আকাশ নামক ছাদ কোনো খুটি ছাড়াই দাড়িয়ে আছে। তাতে গ্রহ-নক্ষত্র প্রদক্ষিণ করছে। কোথাও কোনো সংঘর্ষ বাধছে না। বিরোধ লাগছে না। তেমনিভাবে পৃথিবীও ক্রমাগত দুলছে। কিন্তু পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষ তা টেরও পাচ্ছে না। কোথাও যদি হকপন্থিরা পরাজিত হয় তা হলে তাদেরকে নিজেদের ব্যাপারে হিসাব-নিকাশ করা উচিত। দেখা উচিত যে, তারা এমন কোনো পথ অবলম্বন করেছে কি না, যার কারণে
আল্লাহ অসন্তুষ্ট হচ্ছেন এবং পরীক্ষা নিচ্ছেন? এ সুরায় আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব ও তার কুদরতের উপর সাক্ষ্যদানকারী কিছু তাকবিনি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরার শেষে সেসব কাফেরের আলোচনা করা হয়েছে, যারা মৃত মানুষের মতো। তারা কোনো আয়াত শোনে না। তার প্রতি লক্ষ করে না। তা নিয়ে চিন্তাভাবনাও করে না। আর তা গ্রহণও করে না। বলা হয়েছে, আমি এ কোরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি। আপনি যদি তাদের কাছে কোনো নিদর্শন উপস্থিত করেন তা হলে কাফেররা অবশ্যই বলবে, তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ২০৮-২১০
Comments
Post a Comment