হজরত মুসা ও ফেরাউনের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য তিন ব্যক্তি রয়েছেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম, বনি ইসরাইল ও ফেরাউন। আলোচ্য সুরায় ঘটনার কিয়দংশ উল্লেখ হয়েছে। পুরো ঘটনাটি গোটা কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনা থেকে যেসব শিক্ষা ও উপদেশ হাসিল হয় তা মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি রহ. কাসাসুল কোরআনে উল্লেখ করেছেন। সর্বসাধারণের ফায়দার জন্য এখানে তার সারসংক্ষেপ উল্লেখ করা হল :
১. বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করলে দুনিয়া ও আখেরাতে তার উত্তম প্রতিদান পাওয়া যায়।
২. যে-ব্যক্তি সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তার বিপদ দূর করে দেন।
৩. আল্লাহর সাথে যার প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে, বাতিল যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার কাছে তা অতি তুচ্ছ মনে হয়।
৪. যদি কোনো ব্যক্তি হকের পয়গাম নিয়ে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়ায় তা হলে শত্রুদের মধ্য থেকেই তার সহযোগী তৈরি করে দেওয়া হয়।
৫. যার অন্তরে ঈমান গভীরভাবে স্থান লাভ করে, সে ঈমানের জন্য টাকা-পয়সা, অর্থকড়ি সব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
৬.গোলামির সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, এতে মানুষের দৃঢ় সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে যায় ।
৭. পৃথিবীতে ক্ষমতার উত্তরাধিকার তাদের জন্যই, যারা লড়াই ও সংগ্রানের ময়দানে দৃঢ়পদ থাকে।
৯. আল্লাহর রাতি হচ্ছে, যাদেরকে মানুষ হীন মনে করে একদিন আল্লাহ তাদেরকে জমিনে কর্তৃত্বশালী বানান।
১০. যে-ব্যক্তি বা দল ইচ্ছাকৃতভাবে হক গ্রহণে অবাধ্যতা করবে, আল্লহ্ থেকে সত্য গ্রহণের মানসিকতা ছিনিয়ে নেন।
১১. হকের অনুসরণ করলে পার্থিবভাবেও সফলতা অর্জিত হবে। সফলতা অর্জি না হলে তার অনুসরণ করা যাবে না—এরূপ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
১২. একটা বড় গোমরাহি হচ্ছে মানুষ হক অনুসরণ করার পরিবর্তে হককেই নিজের প্রবৃত্তির গোলাম বানিয়ে ফেলে।
১৩. কেউ সত্য কবুল করুক বা না করুক দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
১৪. মানুষের খারাপ কাজের শাস্তিস্বরূপ তাদের উপর জালেম শাসককে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
১৫. নিজ সম্প্রদায়কে গোলামির জীবন থেকে মুক্তি দেওয়া নবীদের সুন্নাত।
কারুনের ঘটনা
এসব বিষয়ে আলোচনার পর ফেরাউনের মতো আরেক অহংকারী ও অবাধ্য লোকের আলোচনা করা হয়েছে। তার নাম হচ্ছে কারুন। সে-সময়ের; বরং বর্তমান বিশ্বের বড় বড় পুঁজিপতির তুলনায় তার সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল।
সম্পদের প্রাচুর্য তাকে অহংকারী বানিয়ে দিয়েছিল। মুসা আলাইহিস সালাম তাকে বুঝিয়েছেন যে, ধনসম্পদ নিয়ে অহংকার কোরো না। আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তা দ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান করো। ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো, আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন অনুগ্রহ করেছেন।
দুনিয়াদাররা যখন কারুনের ধনসম্পদ দেখত তখন তারা লোভে পড়ে যেত। তারা তার মতো সম্পদ লাভের প্রত্যাশা করত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা একসময় তাকে তার ধনসম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন। আল্লাহর আজাবের ফলে সেইসব দুনিয়াদারের চক্ষু খুলে যায়। তারা স্বীকার করে, যদি আল্লাহ অনুগ্রহ না করতেন তা হলে আমাদেরকেও তিনি ভূগর্ভে বিলীন করে দিতেন।
কিছু উপদেশ
কারুনের ঘটনার পর কোরআন কিছু উপদেশ প্রদান করেছে, প্রত্যেক মুসলমানের যা অনুসরণ করা উচিত। বলা হয়েছে, ‘দুনিয়াতে যারা অহংকার ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না, তাদের জন্য আমি পরকাল প্রস্তুত রেখেছি। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য।
আজ শুধু সাধারণ মানুষই নয়; বরং দীনদার ব্যক্তিদের মধ্যেও অহংকার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যারা এ রোগে আক্রান্ত তাদের জন্য সর্বদা এ আয়াতটি সামনে রাখা উচিত।
সুরার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ধ্বংসশীল। বিধান তারই। তার নিকটই তোমরা ফিরে যাবে। ফেরাউনের মতো বাদশাহ এবং কারুনের মতো সম্পদশালীদের ভয়ঙ্কর পরিণতি একথার দলিল যে, আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ধ্বংসশীল।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
Comments
Post a Comment