নামকরণ
এটি হরফে মুকাত্তায়াত ত-সীন দ্বারা শুরু হয়েছে। নামল অর্থ পিপীলিকা। এ সুরায় পিপীলিকার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে বিধায় একে সুরা নামল বলা হয়।
বিশেষ তিনটি সুরা
এই সুরার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এটি সেই তিন সুরার একটি, যা যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সে ধারাবাহিকতায়ই কোরআনে স্থান পেয়েছে। তা হচ্ছে শুআরা, নামল ও কাসাস। হরফে মুকাত্তায়াতযুক্ত অন্যান্য সুরার ন্যায় এটিও কোরআনুল কারিমের শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিচয়ের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে, এ কিতাব মুমিনদের জন্য হেদায়েত। (১-৩)
কয়েকজন নবীর ঘটনা
হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতি, জিনজাতি এবং পক্ষীকুলকে টি হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের অধীন করে দিয়েছিলেন। তিনি পাখিদের ভাষা বুঝতেন। তার যেসব অবস্থা আল্লাহ তায়ালা কোরআনে আলোচনা করেছেন, নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হল :
হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম একদিন পিপীলিকার উপত্যকা দিয়ে লোক-লশকর নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন, এক পিপীলিকা অন্যান্য পিপীলিকাকে বলছে, তোমরা দ্রুত গর্তে ঢুকে পড়ো, যেন সুলাইমান আলাইহিস সালাম এবং তার বাহিনী অজান্তে তোমাদেরকে পিষে না ফেলে। তিনি পিপীলিকার কথা শুনে মুচকি হাসেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন যে, আপনি আমাকে অনেক নেয়ামত দিয়েছেন। (পাখি ও প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন।)
হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের দরবারে সবসময় হুদহুদ পাখি থাকত। সে একবার তাকে 'সাবা' রাজ্য এবং তার অধিবাসীদের ব্যাপারে সংবাদ দেয়। সে জানায় যে, তারা সূর্যপূজা করে। তিনি চিঠি লিখে সাবার রানিকে তার নিকট আসতে বলেন। সাবার রানি স্বীয় বস্তুগত উপকরণ নিয়ে অনেক গর্ব করত। কিন্তু যখন সে সুলাইমান আলাইহিস সালামের নিত্যনতুন উপকরণ ও তার মহল দেখতে পেল তখন সে নিজের শক্তি-সামর্থ্যের দুর্বলতা অনুভব করতে পারল। ফলে সে ইসলাম কবুল করে নেয়।
এরপর সালেহ আলাইহিস সালাম ও লুত আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সালেহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়কে ঈমানের দাওয়াত দিলে তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়; মুমিন ও কাফের। কাফেরদের মধ্যে নেতাপর্যায়ের নয় ব্যক্তি ছিল। তারা পরস্পর শপথ করেছিল, রাতে আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে নবীকে হত্যা করে ফেলবে। কিছু তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই আল্লহ তাদেরকে পাকড়াও করেন। আজ তাদের স্মরণ করার মতো কেউ-ই নেই।
হজরত লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের দৃষ্টিশক্তি এতটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, তাদের অন্তর এতটাই গোমরাহিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কর্মকে ভালো মনে করতে শুরু করেছে। তাদের এ রীতি বর্তমানেও পাওয়া যায়। যারা হকের উপর চলে, তাদেরকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হয়। আর যারা মন্দ পথে চলে, তাদেরকে আধুনিক ও উন্নত চিন্তার অধিকারী মনে করা হয়। এ পর্যায়ে তাদের জনপদকে উলটে দেওয়া হয়। তাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়। বর্তমানে তারা গোটা বিশ্বের জন্য শিক্ষার উপকরণ হয়ে রয়েছে।
প্রশ্নাকারে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ বিশতম পারার শুরুতে প্রশ্নাকারে আল্লাহ তায়ালার একত্ব ও কুদরতের প্রতিটি দলিল উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালার উলুহিয়্যাত এবং তার একত্বের উপর কোরআন বিশ্বজগৎ এবং মানুষের চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা বাস্তবতার মাধ্যমে দলিল পেশ করে থাকে। এভাবেই কোরআন বিশ্বজগৎকে আলোচনা- পর্যালোচনার বস্তুতে পরিণত করেছে। এর ফলে বিরোধীরা পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ এসব কাজ করতে পারে না।
দ্বিতীয় মৌলিক বিষয় পুনরুত্থান
একত্ববাদের আলোচনার পর দ্বিতীয় মৌলিক বিষয় পুনরুত্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, মুশরিকদের যা বোধগম্য হতো না। তাদের এই আপত্তির উত্তরে আল্লাহ তায়ালা তার নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে মুশরিকদের শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। বলা হয়েছে, অন্যান্য অপরাধীর সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তোমাদের সাথেও তেমন করা হতে পারে। পৃথিবী ঘুরে দেখে নাও যে, তাদের সাথে কীরূপ আচরণ করা হয়েছিল? এরপর কেয়ামতের দৃশ্যের আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর ইসরাফিল আলাইহিস সালামের শিঙ্গায় ফুৎকার না দেওয়া পর্যন্ত এ পৃথিবী বহাল থাকবে। ইসরাফিল যখন প্রথমবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেবেন তখন আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি জীব প্রকম্পিত হয়ে উঠবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়া হবে। তখন বিশ্বজগতের সকল জীব মারা যাবে। এরপর যখন তৃতীয় ফুৎকার দেওয়া হবে তখন সকলেই কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে।
কোরআনের আলোচনার মাধ্যমে যেভাবে সুরাটির সূচনা হয়েছিল সেভাবেই সুরার সমাপ্তিতে বলা হয়েছে, এই পবিত্র কিতাবের শিক্ষা মানুষ শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে সফলতা পাবে।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৯৬-২০০
Comments
Post a Comment