মুমিনের মৌলিক গুণাবলি
সুরা মুমিনুনের মাধ্যমে আঠারোতম পারা শুরু হয়েছে। এ সুরায় দীনের মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সুরার শুরুর ৯ আয়াতে মুমিনদের সাতটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে তারা জান্নাতুল ফেরদাউসপ্রাপ্ত হতে পারে।
গুণগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হল-
১. লৌকিকতা ও কপটতামুক্ত সঠিক ঈমান।
২. নামাজে খুশু-খুজু তথা বিনয় ও নম্রতার সাথে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।
৩. অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা।
৪. সঠিকভাবে জাকাত আদায় করা। অর্থাৎ আল্লাহর হক আদায়ের সাথে সাথে বান্দার হক আদায়েও যত্নবান হওয়া।
৫. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
৬. আমানতের হেফাজত করা এবং ওয়াদা পূরণ করা।
৭. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। সময়, রোকন ও আদবের প্রতি লক্ষ রেখে তা পালন করা
কতটা সত্য এ কোরআন!
মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করার পর মানব-জীবন এবং মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপে ঈমানের যেসব দলিল রয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআন হাজার বছর পূর্বেই মাতৃগর্ভে মানব-শিশুর বিভিন্ন ধাপ অতিবাহিত করার কথা উল্লেখ করেছে। অথচ তৎকালীন আরব-অনারব কারোরই এ ব্যাপারে কোনো জ্ঞান ছিল না। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ও মেডিকেল সাইন্সের গবেষণা মানব-সৃষ্টির ধাপগুলো নিয়ে যা বলছে, হাজার বছর আগেই কোরআন তা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে।
সৃষ্টিজগৎ কার অস্তিত্ব ঘোষণা করে?
মানুষের অস্তিত্বের মাধ্যমে ঈমানের দলিল উল্লেখ করার পর তিন ধরনের তাকবিনি দলিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. সাত আকাশে ও তাতে যেসব আশ্চর্য মাখলুক রয়েছে তাদের সৃষ্টি।
২. বৃষ্টিবর্ষণ এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ফল-ফলাদি উৎপন্ন হওয়া।
৩. চতুষ্পদ জন্তু এবং তার মাধ্যমে দুধ, মাংস ও বোঝাবহনের উপকারিতা অর্জন।
মতানৈক্য দূর করার একমাত্র পথ হচ্ছে দল-মত নির্বিশেষ সকলেরই কোরআন-সুন্নাহর সামনে মাথা নত করে দেওয়া। এক্ষেত্রে মৌলিকভাবে দুটি দল রয়েছে। এক দল পরস্পর দলাদলি হানাহানিতে লিপ্ত। তারা গাফলতি ও অজ্ঞতায় ডুবে আছে। অপর দল আল্লাহর নেক বান্দা। তাদের পরস্পরের মধ্যে মহব্বত ও ভালোবাসা রয়েছে। তাদের অন্তর হেদায়েতের নুরে আলোকিত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারটি গুণ পাওয়া যায়।
১. তারা আল্লাহর আজাবকে ভয় করে।
২. তারা তাকবিনি ও তাশরিয়ি বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখে।
৩. তারা লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকে। তারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করে। ৪. তাদের মধ্যে ইহসান রয়েছে। অর্থাৎ নেক আমল করা সত্ত্বেও তারা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে যে, এই আমল কবুল হল কি না৷ এসব সত্যিকারের মুমিনের বিপরীতে কিছু কিছু হতভাগা কোরআন ও নবীকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে।
কোরআনে তাদের অবাধ্যতার তিনটি বড় কারণ উল্লেখ করা হয়েছে :
১. তারা বিবেক ঘাটায় না। বরং কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার পরিবর্তে তারা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে।
২. হঠকারিতাবশত তারা আল্লাহর রাসুলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। তারা তো রাসুল সামাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব, বংশ, তার সত্যবাদিতা, আমানতদারি সবকিছু সম্পর্কেই সম্যক অবগত। তারা জানে তিনি যা বলছেন। তা মিথ্যা নয়।
৩. এটি প্রশ্নের ভঙ্গিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে কি তোমরা (নাউজুবিল্লাহ) পাগলামি দেখতে পেয়েছো? নিঃসন্দেহে তাদের কেউ কেউ তাকে পাগল আখ্যা দিতো। কিন্তু (নাউজুবিল্লাহ) তাকে পাগল মনে করাটা তাদের ঈমান না আনার কারণ নয়; বরং প্রকৃত কারণ হচ্ছে, তারা হক অস্বীকার করে। হককে নিজেদের প্রবৃত্তির গোলাম বানাতে চায়। অথচ হক তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যেত।
কেয়ামতের দিন মানুষ দু-দলে বিভক্ত হবে
তাওহিদের প্রমাণ উল্লেখ ও শিরক প্রত্যাখ্যানের পর সুরার শেষে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন মানুষ দু-দলে বিভক্ত হয়ে যাবে; সফল ও হতভাগা। সফলদের আমলনামা অত্যন্ত ভারী হবে। দুর্ভাগাদের আমলনামা হবে হালকা। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে দুনিয়াতে তোমরা কত বছর ছিলে? তারা বলবে আমরা মাত্র একদিন বা একদিনেরও কম সময় অবস্থান করেছিলাম। আপনি গণনাকারীদের জিজ্ঞাসা করুন। এরপর আল্লাহ বলবেন, তোমরা সেখানে খুব সামান্য সময় অবস্থান করেছো। হায়, যদি তোমরা জানতে! অর্থাৎ যদি তোমাদের জ্ঞানবুদ্ধি থাকত তা হলে তোমরা বুঝতে পারতে যে, দুনিয়ার জীবন নিতান্তই তুচ্ছ ও সামান্য।
প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে অনুশোচনায় ফেলা। আখেরাতের সীমাহীন জীবনের বিপরীতে দুনিয়ার সামান্য জীবনের তুচ্ছতা বর্ণনা করা। সেদিন তাদেরও দুনিয়ার জীবনের তুচ্ছতা ও সীমাবদ্ধতার অনুভূতি জাগ্রত হবে।
শেষআয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবীর মাধ্যমে যেন গোটা মানবজাতিকে শিক্ষা দিলেন যে, আমার নিকট এই প্রার্থনা করবে, হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার উপর অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয় আপনি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৮০-১৮৩
Comments
Post a Comment