নামকরণ: ইসরা অর্থ রাতে ভ্রমণ করা। যেহেতু এ সুরার শুরুতেই মিরাজের প্রথম অংশ তথা জিব্রাইল আলাইহিস সালাম কর্তৃক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতেরবেলা মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ হয়েছে, তাই একে সুরাতুল ইসরা বলা হয়।
মিরাজ এটা তো অনস্বীকার্য যে, মিবাহ (উর্ধ্বলোক গমন) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক বিরাট মুজিজা। এর মাধ্যমে তাকে অত্যন্ত সম্মানিত করা হয়। গোটা মানবজাতির মধ্য থেকে এ সম্মান একমাত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সামনেই অর্জিত হয়েছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জাগ্রতাবস্থায় ঘটনাটি সংঘটিত হয়। স্বপ্ন যোগে হলে কোরআনে এটা এতটা গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হতো না। আর মুশরিকরাও তখন তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করত না। কেননা স্বপ্নে মানুষ আশ্চর্য থেকে আরও আশ্চর্যজনক দৃশ্য ও ঘটনা দেখে থাকে। কেউ একে মিথ্যা প্রতিপন্নও করে না। এ সুরায় নিরাজের ঘটনা” ব্যতীত যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণিত হয়েছে, নিয়ে তা উল্লেখ করা হল :
১. বনি ইসরাইলের বিশৃঙ্খলা: বনি ইসরাইলকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল, শানে তোমরা দু-বার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। আর দু-বারই আমি আমার বান্দার মাধ্যমে তোমাদের শাস্তি দেব।
প্রথমবার যখন তারা তাওরাতের বিরোধিতা করেছে, শোয়াইব আলাইহিস সালামকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে তখন বুখতে নাসারকে (প্যারিচাদ নেজার) দলবলসহ তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা গোটা জনপদে ছেয়ে যায়। আলেম ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্বিচারে হত্যা করে। ভাওয়াত পুড়িয়ে ফেলে। বাইতুল মাকদিগকে বিরান করে দেয়া। অসংখ্য ইহুদিকে বন্দি করে।
দ্বিতীয়বার তারা হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে শহিদ করে দেয়। পাপাচারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে। এবার ব্যবিলন নগরীর বাদশাহ বেরডোস বা খেরডোসকে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
২। ইসলামি জীবনের প্রায় তেরোটি আদেশ-নিষেধ:
ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রায় তেরোটি আদেশ-নিষেধ ও আদব-আখলাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হল :
১. আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত কোরো না।
২. মাতাপিতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।
৩. আত্মীয়স্বজন, মিসকিন-মুসাফিরদের হক আদায় করো।
৪. অপচয় কোরো না।
৫. কার্পণ্য কোরো না।
৬. হাত এতটা প্রসারিত কোরো না, যাতে আগামীকাল তোমাকে আফসোস করতে হয়।
৭. দরিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা কোরো না।
৮. কোনো প্রাণীকে অন্যায়ভাবে হত্যা কোরো না।
৯. এতিমের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করো না।
১০. অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করো।
১১. সঠিকভাবে ওজন করো।
১২. যে জিনিসের ব্যাপারে তোমার সঠিক জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না।
১৩. জমিনে দম্ভভরে চোলো না।
পরিশেষে দু-দু'বার করে বলা হয়েছে, আল্লাহর সাথে কাউকে মাবুদ সাব্যস্ত কোরো না।
৩. আল্লাহর সন্তান দাবি ও পরকাল অস্বীকারের খণ্ডন
মুশরিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর সন্তান থাকার কথা বলে। তারা পরকাল অস্বীকার করে। বড় আশ্চর্যের সাথে তারা বলে, মৃত্যুর পর যখন আমাদের হাড্ডি চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে যাবে তখনও কি আমাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা হবে! রাসুল সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তারা চাক্ষুষ মুজিজা চেয়েছিল। কখনো তারা বলেছে, যখন আমাদের জন্য জমিন থেকে ঝরনা প্রবাহিত করে দেওয়া হবে তখন আমরা ঈমান আনবো। কখনো তারা বলে, যখন আপনার খেজুর ও আঙুরের বাগান হবে বা আপনি আমাদের উপর আসনান ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলবেন কিংবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদের আমাদের সামনে পেশ করতে পারবেন (তখন আমরা ঈমান আনবো)। কখনো তারা বলেছে, যখন আপনার কোনো স্বর্ণের ঘর হবে কিংবা আপনি আমাদের সামনে আকাশে আরোহণ করে সেখান থেকে কোনো লিখিত কিতাব নিয়ে আসবেন (আমরা তখন ঈমান আনবো)।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৫০-১৫৩
Comments
Post a Comment