নামকরণ: কাহাফ অর্থ গুহা। আসহাবে কাহাফ অর্থ গুহাবাসী। এ সুরায় গুহাবাসীদের ঘটনা। বর্ণিত হওয়ায় একে সুরা কাহাফ বলা হয়।
ফজিলত সুজটির ফজিলতের ব্যাপারে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে-ব্যক্তি সুরা কাহাফের শেষ দশ আয়াত তেলাওয়াত করবে, সে দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।” অন্য এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে-ব্যক্তি জুমআর দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে দুই জুমআর মধ্যবর্তী সময় তার জন্য আলোকিত করে দেওয়া হবে।
সুরা কাহাফ সেই পাঁচ সুরার একটি, যা আলহামদু লিল্লাহ শব্দ দ্বারা শুরু হয়েছে। বাকি চার সুরা হল সুরা ফাতিহা, সুরা আনআম, সুরা সাবা ও সুরা ফাতির।
প্রথম ঘটনা : আসহাবে কাহাফ প্রথম ঘটনাটি আসহাবে কাহাফের। কিছু মুমিন যুবককে বাদশাহ দাকিয়ানুস মূর্তিপূজায় বাধ্য করেছিল। যারা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিরক না করত, সে তাদেরকে হত্যা করে ফেলতো। এসব যুবককে প্রলোভন দেখানো হয় যে, যদি তারা এই শিরকি আহ্বানে সাড়া দেয় তা হলে তাদেরকে অঢেল ধনসম্পদ, উঁচু পদ ও সম্মানিত জীবনের ব্যবস্থা করা হবে; অন্যথায় তাদেরকে হত্যা করা হবে।
এই যুবকরা অন্যান্য জিনিসের উপর ঈমানের সংরক্ষণকে প্রাধান্য দেয়। ঈমান বাঁচানোর জন্য তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। । তারা অনেকদূরে পাহাড়ে আত্মগোপন করার ইচ্ছা করে। যখন তারা গুহায় প্রবেশ করে, আল্লাহ তাদের চোখে গভীর নিদ্রা ঢেলে দেন। এমনকি তারা ৩০৯ বছর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। ঘুম ভাঙলে তারা ক্ষুধা অনুভব করে। তাদের একজন খাবার ক্রয় করার জন্য শহরে আসে। লোকেরা তাকে দেখে উৎসুক হয়ে ওঠে। গত তিনশ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছিল। পৌত্তলিকদের রাজত্ব বহু আগেই গত হয়ে গিয়েছিল। তখন মুমিন বাদশাহর রাজত্ব চলছিল। ঈমানের খাতিরে ঘরবাড়ি ত্যাগ করা এসব যুবক লোকজনের দৃষ্টিতে জাতীয় বীরের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনা : মুসা ও খাযির আলাইহিমাস সালামের সফর: মুসা আলাইহিস সালাম যখন জানতে পারলেন সমুদ্র-তীরে এক ব্যক্তি রয়েছেন, যার নিকট এমন জ্ঞান রয়েছে, যা তার অজানা। তখন তিনি সেই ব্যক্তির সন্ধানে বের হয়ে পড়েন। চলতে চলতে একসময় তিনি সমুদ্র-তীরে পৌঁছেন। তখন খাযির আলাইহিস সালামের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। মুসা আলাইহিস সালাম তার সঙ্গে থাকার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কোনো প্রশ্ন না করার শর্তে খাযির আলাইহিস সালাম তাকে থাকার অনুমতি প্রদান করেন। এরপর তিনটি আশ্চর্য ঘটনা সংঘটিত হয়।
প্রথন ঘটনায় খাযির আলাইহিস সালাম একটি নৌকা ছিদ্র করে ফেলেন। অথচ নৌকার মালিক বিনাভাড়ায় তাকে নৌকায় উঠিয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনায় তিনি এক নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে ফেলেন।
তৃতীয় ঘটনায় তিনি এক জনপদের অধঃপতিত দেয়াল উঠিয়ে দেন; অথচ একসময় এই জনপদবাসীরাই তাকে খানা খাওয়াতে অস্বীকার করেছিল!
মুসা আলাইহিস সালাম এ তিন জায়গার কোথাও চুপ থাকতে পারেননি। তিনি প্রতিবারই খাযির আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছেন কেন আপনি এমন করলেন? তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করার পর খাযির আলাইহিস সালাম তার থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আপনি সামনে আর আমার সাথে থাকতে পারবেন না। তবে এই তিন ঘটনার বাস্তবতা তিনি তার সামনে স্পষ্ট করে দেন।
তৃতীয় ঘটনা : হজরত জুলকারনাইনের প্রাচীর তৃতীয় ঘটনাটি জুলকারনাইনের।
জুলকারনাইনকে আল্লাহ তায়ালা বাহ্যশক্তি দেওয়ার পাশাপাশি রুহানি ও ঈমানিশক্তিও দিয়েছিলেন। তার বিজয়াভিযানের পরিধি অনেক বিস্তৃত ছিল। তিনি একদিক থেকে পৃথিবীর পূর্বপ্রান্ত অন্যদিক থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বিজয়াভিযানের একপর্যায়ে তিনি (যখন পৃথিবীর উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যান, তখন) এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট উপনীত হন, যারা পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করত। এক বর্বর জাতি— কোরআন যাদের ইয়াজুজ-মাজুজ বলে উল্লেখ করেছে সর্বদা তাদের উপর আক্রমণ চালাতো। এই নির্যাতিত সম্প্রদায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জুলকারনাইন এক শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করেন, যার মাধ্যমে তারা ইয়াজুজ-মাজুজের আক্রমণ ও নির্যাতন থেকে নিরাপদ হয়ে যান। কেয়ামতের পূর্বে বা তারও আগে এই দেয়াল ধুলোয় মিশে যাবে। ইয়াজুজ-মাজুজ গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। ঘটনা-তিনটি ছাড়াও প্রদান তিনটি দৃষ্টান্ত প্রদান করা হয়েছে।
বস্তুবাদ ও ইসলাম:
বস্তুগত দিক থেকে জুলকারনাইন বহু শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহ এক মুমিন বান্দা ছিলেন। বর্তমানে বস্তুবাদীদের অন্যতম আদর্শ হচ্ছে পশ্চিমা সভ্যতা। এর সামনে তারা মাথা নত করে থাকে। এক সময় এ সভ্যতার এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব বেরিয়ে আসবে, হাদিসে যাকে দাজ্জাল বলা হয়েছে। মনে হচ্ছে, তার আত্মপ্রকাশের দিন খুব বেশি দূরে নয়। কেননা ঈমান ওবস্তুবাদের মধ্যকার যুদ্ধ সংঘটিত হতে খুব সামান্য সময়ই বাকি আছে। যাব। দাজ্জালি সভ্যতা ও দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের সময় ঈমান রক্ষার ক্ষেত্রে সফল হবে তারাই সৌভাগ্যবান।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৫৪-১৬২
Comments
Post a Comment