হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, সুরা ত্ব-হা সুরা মারিয়াদের পর অবতীর্ণ হয়েছে।' বিষয়ের দিক থেকে সুরা-দুটোয় স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। সুরা মারিয়ামে মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছিল। সুরা ত্ব-হায় তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও এ সুরাতে দীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
নামকরণ ও প্রেক্ষাপট
ত্ব-হা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি নাম। এখানে এর মাধ্যমে তাকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, কষ্ট শিকার করার জন্য আমি আপনার উপর কোরআন অবতীর্ণ করিনি। বিষয়টি হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন মাজিদের দাওয়াত ও তেলাওয়াত—দুই ক্ষেত্রেই অসম্ভব রকমের কষ্ট করতেন। রাতের বেলায় যেমনিভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে লম্বা কেরাতের মাধ্যমে নামাজ পড়তেন, তার পা ফুলে যেত, তেমনি আবার দিনের বেলা নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কোরআান প্রচারের কাজও করতেন।
যখন কেউ তার দাওয়াত কবুল করত না তখন তিনি ভীষণ কষ্ট পেতেন। এই কারণে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন স্থানে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তাকে বোঝানো হয়েছে, আপনি নিজেকে অধিক কষ্টে নিপতিত করবেন না। সবাই এই কোরআনের প্রতি ধাবিত হবে না। যার মধ্যে আমাহর ভয় আছে, তার জন্য এটা নসিহত।
মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা
অন্যান্য নবীর তুলনায় মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা কোরআনে বিস্তারিতভাবে। ও বারবার উল্লেখ হয়েছে। কেননা তার ঘটনাবলিতে বহু আশ্চর্য বিষয় ও ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কথা স্মরণ হয়। মানুষ তার নেয়ামতের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারে। সম্ভবত বারবার ঘটনা উল্লেখ করার একটা কারণ এটাও যে, প্রত্যেক জমানায় কোনো-না-কোনো ফেরাউনের অস্তিত্ব থাকে, তার মোকাবেলায় মুমিনদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
সুরা ত্ব-হার ৯নং আয়াত থেকে ৯৮নং আয়াত পর্যন্ত মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে তার জীবনের অধিকাংশ ঘটনাই চলে এসেছে। তবে ঘটনাগুলো ধারাবাহিক নয়; বরং কিছুটা আগপিছ করে বলা হয়েছে। উদাহরণত এখানে আলোচনা শুরু হয়েছে তার মাদয়ান থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় আগুন দেখা, আল্লাহ তায়ালার সাথে কথা বলা এবং নবুওয়াতপ্রাপ্তির ঘটনার মাধ্যমে। কিন্তু জন্মগ্রহণের পর সিন্দুকে বন্দি করে তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার ঘটনাটি পরে উল্লেখ হয়েছে। এমনটি করার বড় কারণ হল আলোচনায় বৈচিত্র্য আনা।
সুরা ত্ব-হায় মুসা আলাইহিস সালামের যেসব অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, তা হল :
১. আল্লাহ তায়ালার সাথে কথা বলা।
২. তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা।
৩. আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাকে এবং তার ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে ফেরাউনের নিকট যাওয়ার নির্দেশ। ফেরাউনের সাথে সদুপদেশের নীতিতে আলোচনা করা।
৪. মুসা আলাইহিস সালামের মোকাবেলার জন্য ফেরাউন কর্তৃক জাদুকরদের একত্র করা।
৫. মুসা আলাইহিস সালামের বিজয়।
৬. জাদুকরদের ঈমান গ্রহণ। রাতারাতি মুসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমে বনি ইসরাইলদের মিসর থেকে বের হয়ে যাওয়া।
৭. ফেরাউন কর্তৃক সদলবলে তাদের পশ্চাদ্ধাবন এবং তাদের ধ্বংস। দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের প্রতি বনি ইসরাইলের অস্বীকৃতি ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
৮. সামেরির গোবৎস বানানো।
৯. বনি ইসরাইলের গোবৎসপূজা। মুসা আলাইহিস সালামের তুর পর্বত থেকে প্রত্যাবর্তন।
১০. ভাইয়ের উপর রাগের বহিঃপ্রকাশ।
এই ঘটনার শেষে কোরআনে বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করার হেকমত এবং যারা কোরআন থেকে বিমুখ হয়, তাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এ প্রসঙ্গে ১০৬নং আয়াত থেকে ১১২ নং আয়াত পর্যস্ত কেয়ামতের ভয়ংকর অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
ভুলত্রুটি মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এ বিষয়টি বর্ণনা করার জন্য আদম আলাইহিস সালামের ফল খাওয়ার নির্দেশ ভুলে যাওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর ইবলিসের সাথে যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। (১১৫-১২২)
যারা কোরআন থেকে বিমুখ হয়ে রয়, তাদের জন্য রয়েছে মারাত্মক শান্তি। তাদের জীবন সংকীর্ণ হয়ে যাবে। কেয়ামতের দিন তাদেরকে অন্ধ করে ওঠানো হবে। যারা কোরআনুল কারিমের মতো মুজিজা দেখা সত্ত্বেও (পূর্বের নবীদের আল্লাহপ্রদত্ত চাক্ষুষ মুজিজা, যেমন) লাঠি ও উটের মতো মুজিজার দাবি করে, তাদের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। (১৩৩)
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৬৬-১৬৯
Comments
Post a Comment