অন্যান্য মক্কি সুরার ন্যায় সুরা মারইয়ামেও আল্লাহর অস্তিত্ব, তার একত্ববাদ, পুনরুত্থান ও বিচার দিবস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই সুরায় আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন নবীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ঘটনা:
জাকারিয়া আলাইহিস সালামের সন্তানলাভ সর্বপ্রথম জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গিয়েছিলেন। তার শরীরের হাড়গোড় দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। তার স্ত্রীও বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বন্ধ্যা ছিলেন। জাকারিয়া আলাইহিস সালামের বয়স ছিল তখন ১২০ বছর। তার স্ত্রীর বয়স হয়েছিল ৯৮। বাহ্যত তখন তাদের সন্তান হওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু তবু তারা আল্লাহর নিকট সন্তানের জন্য আবেদন করেছেন। সন্তান চাওয়ার পূর্বে তারা আল্লাহর নিকট তিনটি বিষয় পেশ করেছেন।
প্রথমত, আমি অত্যন্ত দুর্বল
দ্বিতীয়ত, তবে আমি নিরাশ নই। কেননা আপনি কখনো আমার দোয়া প্রত্যাখান করেননি।
তৃতীয়ত, এ দোয়া দ্বারা দীনের কল্যাণ উদ্দেশ্য।
এরপর তিনি স্বীয় দীনি স্থলাভিষিক্ত হিসেবে এক পুত্রসস্থানের আবেদন করেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। অত্যন্ত ইবাদতগুজার, দুনিয়াবিমুখ এক সন্তান হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে দান করা হয়। আল্লাহ তায়ালা সেই সন্তানকে নবুওয়াতও দান করেছেন।
হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের ঘটনা:
হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয়েছিল পিতা ছাড়াই। তার মা কুমারী ছিলেন। আলোচ্য সূরা মারিয়ামে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
কীভাবে তিনি পরিবার-পরিজন ছেড়ে ইবাদতের জন্য বাইতুল মাকদিসের পূর্ব যোগে চলে গিয়েছিলেন? কীভাবে জিবরাইল আলাইহিস সালাম তার নিকট আসে? তার গ্রীবাদেশে ফুঁক দেন আর এতে তিনি গর্ভবতী হয়ে ওঠেন? কীভাবে তিনি বিপদ ও দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হয়েছিলেন (এসব বিষয় এ সুরায় উল্লেখ হয়েছে)?
প্রসবের পর সন্তান নিয়ে যখন তিনি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট আসেন তখন ইহুদীদের মুখ বেসামাল হয়ে যায়। তারা মারিয়াম আলাইহাস সালামের উপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করে। হজরত মারিয়াম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে ছেলের দিকে ইঙ্গিত করেন। মায়ের কোলে থাকা শিশু তখন কথা বলতে থাকে। তার মুখ থেকে সর্বপ্রথম যে বাক্য বের হয়, তা হচ্ছে, নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা:
সুরা মারিয়ামে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার মুশরিক পিতার মাঝে সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার মাধ্যমে শিরকের অসারতা, ধোঁকা, প্রতারণা, হঠকারিতা, গোমরাহি ও বোকামির ঝলক পরিলক্ষিত হয়। তেমনিভাবে এর দ্বারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের চরিত্র, তার মহান গুণাবলি, বিশেষত তার ধৈর্য ও হেকমতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য, যাতে দাওয়াতের ময়দানের কর্মীদের সামনে একজন প্রকৃত দায়ীর চিত্র উঠে আসে। তারা যেন তাকে নিজেদের আদর্শ বানিয়ে নেয়। তেমনিভাবে এ ঘটনা থেকে টিকা পাওয়া যায় যে, তাকের দাওয়াত এবং হকের উপর দৃঢ় থাকার কারণে হজরত ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালামের উপর আল্লাহর কী রহমত বর্ষিত হয়েছে। তার বংশ থেকে এক বিশাল জাতি তৈরি হয়েছে। তার সন্তানদের মধ্যে নবী-রাসুল, বিশেষত সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম জন্ম নিয়েছেন। এটা অত্যন্ত আশ্চর্য যে, দুনিয়ার সকল জাতি নিজেদের হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দিকে সম্বোধিত করাকে গর্বের বিষয় মনে করে।
মুমিনদের প্রতি মানুষের মনে মহব্বত:
সুরার শেষে বলা হয়েছে, মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা মানুষের মনে মহব্বত তৈরি করে দেন। আর অপরাধীদের পূর্ববর্তী অপরাধীদের মতোই ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখবে, শুধু তার জন্যই আপন জীবন ব্যয় করবে, মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দেওয়া হয়।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৬২-১৬৫
Comments
Post a Comment