নামকরণ: সুরা আম্বিয়ার মাধ্যমে সতেরোতম পারা শুরু হয়েছে। এই সুরাতে সতেরোজন নবীর আলোচনা এসেছে। তাই একে সুরা আম্বিয়া বলা হয়।
সুরা আনবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে উল্লেখ করা হল:
কেয়ামত অতি নিকটে
১. সুরা আনবিয়ার শুরুতে পার্থিব জীবনে ক্রান্তিকালের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হিসাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর দিনের ব্যাপারে মানুষ উদাসীনতায় ডুবে আছে। না তারা এজন্য কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছে আর না এমন কোনো কাজ করছে, যা তখন কাজে আসবে। তাদের সামনে যখন নতুন কোনো আয়াত আসে, তখন তারা তা নিয়ে ঠাট্টা- বিদ্রুপ করে। তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। তারা জানেই না যে, কতটা বিনয়- নম্রতার সাথে এ মহান কালাম শ্রবণ করা উচিত!
সকল নবীই মানুষ ছিলেন
২. মুশরিকরা পরস্পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে বলত, এই লোক মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার। সে রাসুল নয়; সে বরং তোমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। অন্যান্য নবীর মতো সে চাক্ষুষ মুজিজা প্রদর্শন করতে অক্ষম। কোরআনে এর উত্তরে বলা হয়েছে, পূর্বে যত নবী-রাসুল প্রেরিত হয়েছে, তারা সকলেই মানুষ ছিলেন। তারা পানাহার করতেন। মানবিক প্রয়োজন পুরা করতেন। এমন কোনো নবী ছিলেন না, যার মানবিক প্রয়োজন পুরণ করতে হতো না।
একত্ববাদের অসংখ্য প্রমাণ
৩. বিশ্বজগতের উন্মুক্ত গ্রন্থে রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদের অসংখ্য দলিল- প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এ বিশ্বজগতে আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, দিনরাত্রি যা কিছু রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তা খেল-তামাশার জন্য সৃষ্টি করেননি; বরং এর পেছনে অনেক হেকমত নিহিত রয়েছে। এসব সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হল, মানুষ যেন এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যে, বিশ্বজগতের সবকিছু আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করে।
মুশরিকদের তিরস্কার
৪. মুশরিকরা আল্লাহর পরিবর্তে বিভিন্ন জড়পদার্থের সামনে মাথা নত করত। তাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে, এসব মূর্তি কীভাবে ইবাদতের উপযুক্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের থেকে দলিল চাওয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য, তাদের নিকট প্রতিমাপূজার পক্ষে না যুক্তিনির্ভর কোনো দলিল আছে আর বর্ণনানির্ভর কোনো ঐশী প্রমাণ রয়েছে।
একক স্রষ্টার অস্তিত্বের ব্যাপারে ছয়টি দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে। দণিগুলো তাকবিনি (বিশ্বজগতের নিপুণ ব্যবস্থাপনায় নিহিত দলিল)। নিম্নে আমরা সেগুলো তুলে ধরছি :
প্রথম দলিল: আসমান-জমিন উভয়টিই মিলিত ছিল। আমি উভয়কে পৃথক করে দিয়েছি। আকাশকে ফেরেশতাদের ঠিকানা বানিয়েছি। আর জমিনকে মানুষের বাসস্থান বানিয়েছি। কোরআন আসমান ও জনিনের নিলিত থাকার যে বিষয়টি উল্লেখ করেছে, তা তৎকালীন বিশ্বের কেউ-ই জানত না। আরবরা ও জানত না। এখন প্রায় দু-শতাব্দী হল, পদার্থবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, গ্রহ-নক্ষত্র, আসমান-জমিন মিলিত ছিল। এরপর একটি অপরটির থেকে পৃথক হয়ে গেছে। আজ থেকে চোদ্দশ বছর পূর্বে কোরআনের নির্দ্বিধায় এ বাস্তবতা উল্লেখ করা মুজিজা ছাড়া কী হতে পারে?
দ্বিতীয় দলিল : আমি প্রত্যেক জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। বর্তমান বিশ্বের সকল জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে যে, সকল জীবের মধ্যে পানির উপাদান রয়েছে। পানি ব্যতীত কখনো জীবন সঞ্চার হতে পারে না। মানুষ, জীবজন্তু, বৃক্ষলতা সবকিছুই পানির মুখাপেক্ষী। বিজ্ঞানীরা আজ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু আগেই তা বলে গেছেন। চন্দ্রের দিকে লক্ষ করুন। তা পৃথিবীর মতোই। কিন্তু পানি না থাকায় সেখানে জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।
তৃতীয় দলিল : জমিনে আমি পাহাড় স্থাপন করেছি, যাতে মানুষদের নিয়ে তা হেলে না পড়ে। যদি এসব পাহাড় না থাকত তা হলে পৃথিবী ক্রমাগত দোল খেতে থাকত। ভূগর্ভের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করা যেত না। এখন ও যে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়গিরির পাহাড় পরিলক্ষিত হয়, এর মাধ্যমে যেন পৃথিবী শ্বাস- প্রশ্বাস নিয়ে থাকে।
চতুর্থ দলিল : আমি পৃথিবীতে প্রশস্ত রাস্তা বানিয়েছি, যাতে মানুষ তার উপর চলাফেরা করতে পারে। যদি সমতল ভূমি থেকে একটু দৃষ্টি ফিরিয়ে আমরা পাহাড়ের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তা হলে দেখতে পাবো যে, এতসব সারি সারি উঁচু দুই পাহাড়ের মাঝেও এমন প্রশস্ত চলার পথ ও পানির প্রস্রবণ রয়েছে, যার ফলে সফরের সময় এখানে চলাফেরা করতে মানুষের তেমন কষ্ট পেতে হয় না।
পঞ্চম দলিল : আকাশকে আমি সংরক্ষিত ছাদ বানিয়েছি। এ ছাদে চন্দ্র-সূর্য এবং লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র রয়েছে, যা অতি দ্রুততার সাথে স্বীয় কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করছে। এগুলোর মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয় না। এরা কখনো নিজ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয় না। কোনো নক্ষত্র যদি আপন কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে পড়ে তা হলে বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনাই ভণ্ডল হয়ে যাবে।
ষষ্ঠ দলিল : এটি তাকবিনি দলিল। এতে বলা হয়েছে, দিনরাত, চন্দ্র-সূর্য সবকিছু আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। এগুলো আকাশে সাঁতার কাটে। এগুলো পরস্পর প্রদক্ষিণ করে। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় না। এগুলো ধারাবাহিকভাবে ক্রমাগত প্রদক্ষিণ করে আর প্রদক্ষিণ করাই তাদের কাজ। (৩০-৩৩)
সতেরোজন নবীর আলোচনা
তাওহিদ, নবুওয়াত, আখেরাত ও হিসাব-নিকাশের দলিল উল্লেখ করার পর সতেরোজন নবীর আলোচনা করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন হজরত মুসা, হজরত হারুন, হজরত ইবরাহিম, হজরত লুত, হজরত ইসহাক, হজরত ইয়াকুব, হজরত নুহ, হজরত দাউদ, হজরত সুলাইমান, হজরত আইয়ুব, হজরত ইসমাইল, হজরত ইদরিস, হজরত জুলকিফল, হজরত ইউনুস, হজরত জাকারিয়া, হজরত ইয়াহইয়া ও হজরত ঈসা আলাইহিমুস সালাম। এই সকল নবীর দাওয়াত এক ও অভিন্ন ছিল। তারা বলতেন, যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে আর মুমিন হবে, তার প্রচেষ্টা বৃথা যাবে না।
সতেরোজন নবীর মধ্যে ছয়জনের ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে।
১. হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে একত্ববাদের দাওয়াত দেওয়ায় এবং শিরক প্রত্যাখ্যান করায় আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে রক্ষা করেছে।
২. তার ভাতিজা হজরত লুত আলাইহিস সালামকে এক নিকৃষ্ট সম্প্রদায়ের নিকট নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল।
৩. হজরত নূহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ সাড়ে নয়শ বছর আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দিয়েছেন। অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। এ কারণে তাকে শাইখুল যেতে পারে।
৪. হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম এবং তার পুত্র সুলাইমান আলাইহিস সালামের ঘটনা। তারা নবীও ছিলেন আবার বাদশাহও হয়েছিলেন। তাদেরকে বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উভয় ধরনের নেয়ামত দেওয়া হয়েছিল।
৫. হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে বিপদ-আপদ ও কষ্টে ফেলে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তিনি দৃষ্টান্তমূলক ধৈর্য প্রদর্শন করেছেন। বিপদ-আপদে সবসময় তিনি আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট ছিলেন। এ নিবিষ্টচিত্ততার ফলে তিনি আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার দোয়া কবুল করা হয়েছে। তার মুসিবত উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।
৬. হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের ঘটনা। মাছ তাকে গিলে ফেলেছিল। মাছের পেটে থেকে তিনি আল্লাহকে ডেকেছেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। তাকে বিপদ থেকে মুক্ত করেছেন। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহকে ডাকে, তিনি তাদেরকে বিপদমুক্ত করে থাকেন।
৭. ইয়াজুজ-মাজুজ। সুরা কাহাফে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ সুরায় পুনরায় তাদের আলোচনা এসেছে। বলা হয়েছে, কেয়ামতের পূর্বসময়ে ইয়াজুজ-মাজুজকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান থেকে নেমে আসবে।
৮. মুশরিক এবং তাদের মূর্তিগুলোকে কেয়ামতের দিন জাহান্নামের ইন্ধন বানানো হবে। সেদিন কেউ কারও উপকার করতে পারবে না।
৯. পূর্ববর্তী নবীদের ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহকাল ও পরকালে সকলের জন্য রহমত। সকলের নিকট তিনি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু যখন যাবতীয় দলিল উল্লেখ করা সত্ত্বেও কাফেররা বোঝেনি। তখন তিনি আল্লাহর নিকট দোয়া করেছেন, হে আনার প্রতিপালক, আপনি ন্যায়ানুগ ফয়সালা করে দিন। আমাদের পালনকর্তা তো দয়াময়, তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে আমরা তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ তায়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দোয়া কবুল করেন। বদরযুদ্ধে মুশরিকদের উপর তিনি আজাব অবতীর্ণ করেন।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৭০-১৭৫
Comments
Post a Comment