নামকরণ মৌমাছিকে আরবিতে নাহল বলা হয়। এ সুরায় যেহেতু মৌমাছির আলোচনা করা হয়েছে এজন্য একে সুরা নাহল বলা হয়।
মৌমাছির ইতিবৃত্ত: মৌমাছি অন্যান্য মাছির মতোই এক প্রজাতির মাছি। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কুদরতে সে এমন বিস্ময়কর কাজ করে থাকে, যা ভাবতে গিয়েও মানুষ অক্ষম হয়ে যায়। যেমন : চাক তৈরি করা, পরস্পর দায়িত্ব বণ্টন, দূরদূরান্তের গাছপালা, বাগান, ফলফসল থেকে ফোঁটা ফোঁটা মধু সংগ্রহ ইত্যাদি। মোটকথা তাদের প্রতিটি কাজই আশ্চর্যজনক। তাদের বানানো চাকে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার ঘর থাকে। প্রতিটি পর ছয় কোণবিশিষ্ট। এই চাকে মধু জমা করার গুদাম, সন্তান প্রসবের ঘর. পেশাব-পায়খানা করার কক্ষ সবকিছুর জন্যই পৃথক পৃথক জায়গা রয়েছে।
কোনো মৌমাছি যখন তালাশ করে কোথাও মধুর সন্ধান পায় তখন সে বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে সাথি মৌমাছিদের সেখানে পৌছার রাস্তা বলে দেয়। যে ফুল থেকে
মধু নিংড়ে নিয়েছে, সে তাতে এক আলামত রেখে আসে, যাতে এতে বসে তার সাি মৌমাছিদের সময় নষ্ট না হয়। যদি কোনো মৌমাছি ভুলে কোনো নোংরা ও ময়লার উপর বসে যায় কিংবা কোনো বিষাক্ত উপাদান নিয়ে আসে তা হলে চেকিংয়ের দায়িত্বে থাকা মৌমাছিরা তাকে বাইরে থেকে প্রতিরোধ করে। তাকে এজন্য শাস্তি প্রদান করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার নির্দেশেই মৌমাছি এসব কাজ করে থাকে। তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে চিন্তাশীলদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।
সূরা নাহলকে সুরা নিয়ামও বলা হয়। কেননা এতে অধিক পরিমাণে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কথা আলোচিত হয়েছে। । তিনি পৃথিবীকে বিছানা বানিয়েছেন। আকাশকে ছাদ বানিয়েছেন। মানুষকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন উপকার দিয়ে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যা নিয়ে মানুষ গর্ব করে থাকে।তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন। সে বৃষ্টির মাধ্যমে যাইতুন, খেজুর, আঙুরসহ অনেক ফলমূল ও শস্যদানা তৈরি হয়। চন্দ্র-সূর্যকে তিনি মানুষের সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন।
কোরআনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আয়াত
এ সূরায় কোরআনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আয়াত রয়েছে, সুরা নাহলের ১০নং আয়াতই সেই আয়াত। এই আয়াতে তিনটি বিষয়ের তা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তিনটি বিষয় বারণ করা হয়েছে। ইনসাফ, ইহসান এবং নিকটাত্মীয়দের (তাদের হক) দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের (কথা ও কাজের) অশ্লীলতা ও (শরিয়ত নিষিদ্ধ) মন্দ এবং সীমালঙ্ঘন থেকে বারণ করা হয়েছে।
১. ইনসাফ সব ধরনের আমল ও লেনদেনের ক্ষেত্রে তা রক্ষা করা আবশ্যক। ফরজ-ওয়াজিব বিধান পালন, সন্তানসন্ততি, শত্রু-মিত্র, পাড়া- প্রতিবেশী, সাথি-সঙ্গী, স্ত্রী- খাদেম সবার সাথেই ইনসাফ করা আবশ্যক।
২. প্রত্যেক ভালো কাজই ইহসান। ইহসানের সম্পর্ক যেমন আল্লাহর সাথে রয়েছে, তেমনিভাবে মানুষের সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
৩. দরিদ্র ব্যক্তিদের সাহায্য করা উচিত। তবে নিকটাত্মীয়দের সাহায্য করলে এতে দ্বিগুণ সাওয়াব পাওয়া যাবে।
8. কথা ও কাজের প্রত্যেক মন্দ কাজ হচ্ছে ফাহশা । যেমন, ব্যভিচার, পুংমৈথুন, মদ, প্রভৃতি।
৫. মুনকার : শরিয়তের দৃষ্টিতে যেটা মন্দ এবং সুস্থ বিবেক যাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে।
৬. বাগি (৩) মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মানের উপর সীনালঙ্ঘন করা।
সুরার শেষে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রশংসা করা হয়েছে। সারা জীবন তিনি খালেস তাওহিদের উপর ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার অনুসরণের হুকুম দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, আপনি লোকদের হেকমত (প্রজ্ঞা) ও মাওয়িযায়ে হাসানা তথা উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করুন। এ পথে আসা বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করুন।
সুরার শুরু আয়াতগুলো সেইসব ব্যক্তির উত্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা আজাব দ্রুত আসতে বলেছিল। তাদের এসব বেহুদা দাবির ব্যাপারে সুরার শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধৈর্য ধারণ করার এবং হীনম্মন্য না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর দ্বারা সুরার শুরু ও শেষের মধ্যে সুস্পষ্ট মিল বুঝে আসে।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৪৬-১৪৯
Comments
Post a Comment