নামকরণ: এতে হিজর উপত্যকায় বসবাসকারী সম্প্রদায়ের আলোচনা এসেছে বিধায় এতে সুরা হিজর বলা হয়। হিজর উপত্যকাটি মদিনা ও শামের মাঝামাঝি অবস্থিত। এ সুরার শুধু প্রথম আয়াতটি তেরোতম পারায়, বাকি পূর্ণ সুরা চোদ্দতম পারায় অবস্থিত। এ সুরাটিও হরফে মুকাত্তায়াত দ্বারা শুরু হয়েছে। এর প্রথম আয়াতে কোরআনুল কারিমের প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। সুরাটিতে ইসলামের মৌলিক আকিদার বিষয়টি প্রমাণ করা হয়েছে। এই সুরাতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ হয়েছে, নিম্নে তা তুলে ধলা হল :
১. কেয়ামতের দিন কাফেররা আজাবের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে বলে উঠবে, হায়, আমরা যদি মুসলমান হতাম! কিন্তু সেদিন ঈমান ও ঈমান আনার কামনা কোনোটাই কাজে আসবে না।
২. কোরআনের এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এর হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য আসমানি কিতাব হেফাজতের দায়িত্ব সে সম্প্রদায়ের কাঁধেই ছিল, যার কারণে মানুষের হস্তক্ষেপ থেকে তা রেহাই পায়নি। কিন্তু বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোরআন সবধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বেশকম থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও নিরাপদ রয়েছে।
৩. এ সুরার বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালার কুদরত ও তার একত্বের দলিল উল্লেখ করা হয়েছে, যা চিৎকার করে বিশ্বজগতের স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তার বছরের সাক্ষ্য দিচ্ছে। এ দলিল-প্রমাণগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মহান আল্লাহর সৃষ্টিরাজিতে।
৪. এরপর মানব-সৃষ্টির ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রথম মানব হজরত আদম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তায়ালার কুদরতের এক বড় নিদর্শন। প্রাণহীন মাটি থেকে আল্লাহ তায়ালা প্রাণবিশিষ্ট মানুষ সৃষ্টি করেছেন, যে নড়াচড়া করতে পারে। বিভিন্ন জিনিস নিজের আয়ত্তে আনতে পারে। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহ তায়ালার পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান হওয়ার সবচেয়ে বড় দলিল।
৫. বান্দাদের উপর আল্লাহ তায়ালার কৃত অনুগ্রহ ও রহমতের আলোচনা করা হয়েছে। বান্দা যতই গুনাহগার হোক না কেন, তাকে আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহ সব ধরনের গুনাহ মাফ করে দেন। তার রহমত তার ক্রোধের উপর জয়ী হয়।
এই আয়াতসমূহে আশা ও ভীতিকে একত্র করা হয়েছে।
৬. আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের বর্ণনার পর ইবরাহিম আলাইহিস সালানের নিকট মানুষের সুরতে মেহমান হিসেবে যে ফেরেশতা এসেছিল, তাদের আলোচনা করা হয়েছে। সন্তানের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য তারা এসেছিলেন।
৭.ফেরেশতারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে সুসংবাদ শুনিয়ে দূত আলাইহিস সালামের নিকট হাজির হয়। তাকে বলে, আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নিয়ে রাতের আঁধারে এই জনপদ থেকে বের হয়ে যাবেন। কেননা তারা অবাধ্যতা ও গুনাহর ক্ষেত্রে এতটাই সীমালঙ্ঘন করেছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জমিন থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ফয়সালা করেছেন।
৮. হিজর উপত্যকায় বসবাসকারী হজরত সালেহ আলাইহিস সালামপর সম্প্রদায় অত্যাচারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছিল। অনেক বোঝানোর পরেও তারা প্রতিমাপূজা থেকে বিরত হয়নি। তাদেরকে বিভিন্ন মুজিজা দেখানো হয়েছে। বিশেষত পাথরের পাহাড় থেকে উদ্ভী বেরিয়ে আসার মুজিজা দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল অনেক মুজিজার সমষ্টি। যেমন : পাথরের পাহাড় থেকে উষ্ট্রী বের হওয়া, বের হওয়া মাত্র বাচ্চা প্রসব করা, উষ্ট্রীর শরীর অস্বাভাবিক রকমের বড় হওয়া, অনেক দুখেল হওয়া। কিন্তু হতভাগারা এ মুজিজার কোনো মূল্যায়ন করেনি। ঈমান আনার পরিবর্তে তারা সেই উষ্ট্রীকে হত্যা করে ফেলে তাই হিজরবাসীদের উপর আজাব নেমে আসে।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১৪১-১৪৬
Comments
Post a Comment