কোরআনের মহত্ত্ব বর্ণনার মাধ্যমে এ সুরা শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে, স্বীয় আয়াত, অর্থ ও বিষয়ের দিক থেকে এই কোরআন (দলিল-প্রমাণ দ্বারা) মুহকাম তথা সুন্দর কিতাব। এতে কোনো ত্রুটি নেই। কোনো ধরনের বৈপরীত্য নেই। মুহকাম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল, এমন এক সত্তা এ কিতাবের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করেছেন, যিনি হাকিম (প্রায়) ও খবির (সর্বজ্ঞাত)
এরপর তাওহিদের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। তাওহিদের প্রতি আহ্বানের পর গোটা বিশ্বজগতে ছড়িয়ে থাকা তাওহিদের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। তিনিই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু যারা তার দলিল-প্রমাণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না, হঠকারিতাবশত যারা নিজেদের চোখে পট্টি বেঁধে রেখেছে, তারা তাওহিদ অস্বীকার করে থাকে।
আল কোরআনের চ্যালেঞ্জ
যারা কোরআনকে আল্লাহ তায়ালার কালাম বলে স্বীকার করে না সেই অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে যে, কোরআন যদি আসলেই মানবরচিত হতো তা হলে তোমরাও এর মতো দশটি সুরা বানিয়ে নিয়ে এসো।
অস্বীকারকারীদের প্রতি তিন-তিনবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়।
প্রথমবার সুরা ইসরাতে (আয়াত : ৮৮) কোরআনের মতো একটি পূর্ণ কিতাব আনার চ্যালেগ্ন করা হয়।
দ্বিতীয়বার সুরা হুদে (আয়াত : ১৩) কোরআনের মতো দশটি সুরা বানানোর এবং
তৃতীয় বার সুরা বাকারায় ( আয়াত : ২৩) ও সুরা ইউনুছ (আয়াত: ৩৮) কোরআনের মতো একাট সুরা বানানোর চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়।
কিন্তু কোনোবারই তারা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়নি।
এ ছাড়াও এ সুরায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, নিম্নে তা বর্ণনা করা হলো:
মানুষের দুটি শ্রেণি: প্রথম শ্রেণির মানুষের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে শুধুই দুনিয়া। তারা জীবনকে অধিক থেকে অধিকতর আরামদায়ক বানানোর চিন্তা-ফিকিরে সব সময় মত্ত থাকে। তারা ভুলেও আখেরাতের কথা স্মরণ করে না।
দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা দুনিয়ার জন্য চেষ্টা-পরিশ্রম করে বটে; তবে তাদের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার লক্ষ্য থাকে আখেরাত। তারা আখেরাতকে সামনে রেখেই দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করে থাকে ।
প্রথম শ্রেণির উদাহরণ অন্ধ ও বধির লোকদের মতো। আর দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের উদাহরণ চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তির অধিকারী ব্যক্তির মতো।
কোরআনুল কারিমের বৈচিত কোরআনুল কারিমের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দলিলের আলোকে কাফের- মুশরিকদের মত খণ্ডন করার পর এতে পূর্ববর্তী নবী-রাসুল ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়। এর ফলে দলিল-প্রমাণ আরও শক্তিশালী হয়। আলোচনায় বৈচিত্র্য আসে। আর মানুষ সাধারণত বৈচিত্র্যময়তা পছন্দ করে থাকে। আল্লাহ তায়ালা যেমনিভাবে তাকবিনি (সৃষ্টিগত) নিদর্শন তথা এই বিশ্বজগতের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের প্রতি লক্ষ রেখেছেন তেমনি তিনি শরয়ি নিদর্শনসংবলিত কোরআনুল করিমের আলোচনার ক্ষেত্রেও সেদিকে খেয়াল রেখেছেন।
মক্কার মুশরিকরা ভালো করেই জানত যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন উম্মি (নিরক্ষর) মানুষ। তিনি না পড়তে জানতেন আর না লিখতে পারতেন। আর না তিনি কারো শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তবু তিনি সম্পূর্ণ নিখুঁত, নির্ভুল ও বিশুদ্ধভাবে এসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ওহী ব্যতীত তা কী করেই বা সম্ভব? কোরআন এ বিষয়টির প্রতি মনোনিবেশ করার জন্য নবী-রাসুলদের ঘটনা বর্ণনা করার পর সাধারণত ওহী ও নবুওয়াতের আলোচনা করে থাকে।
ইসতিকামাত থাকা এমন এক নির্দেশ, যার সম্পর্ক আকিদা-বিশ্বাস, কথা-কাজ, আচার-ব্যবহার সর্বকিছুর সাথে। ইসতিকামাত (দৃঢ়পদ) থাকা কোনো সহজ বিষয়। নয়; বরং তা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আল্লাহ তায়ালা তার বিশেষ কিছু বান্দাকে এর তাওফিক দান করে থাকেন।
ইসতিকামাত (দৃঢ়পদ) থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ যে বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছেন সে অনুযায়ী পূর্ণ জীবন পরিচালনা করা। হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই আয়াতের চেয়ে কঠিন কোনো আয়াত অবতীর্ণ হয়নি । সাহাবিগণ একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু দাড়ি সাদা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসুল, আপনি এতো দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন! তিনি তখন বললেন, হুদ এবং এ ধরনের সুরাগুলো আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১২৭ -১৩০
Comments
Post a Comment