প্রেক্ষাপট
সুরা তাওবা: এটি মাদানি সুরা। আয়াতসংখ্যা : ১২৯। রুকুসংখ্যা : ১৬
নবম হিজরিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়েছিলেন তখন সুরাটি অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধকে গাজওয়ানে তাবুক (তাবুকের যুদ্ধ)-ও বলা হয়।
তখন ভীষণ গরম ছিল। সফর ছিল অনেক দীর্ঘ। মদিনাবাসীদের জীবনধারণের প্রধান মাধ্যম—ফলফলাদিও তখন পাকা শুরু হয়েছিল। শত্রুবাহিনীও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, তৎকালীন বিশ্বে যারা নিজেদেরকে পরাশক্তি মনে করত। মোটকথা, এ যুদ্ধ মুমিনদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। এটি তাদের ইখলাস ও সত্যবাদিতার পরীক্ষা ছিল। এ যুদ্ধের মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য তৈরি হয়ে যায়।
সুরা তাওবার মৌলিক উদ্দেশ্য দুটি।
১. মুশরিক ও আহলে কিতাবদের সাথে জিহাদের বিধান বর্ণনা করা।
২. তাবুকযুদ্ধের মাধ্যমে মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্যরেখা টেনে দেওয়া ৷
এ সুরায় আহলে কিতাবদের সাথে যুদ্ধের অনুমতি, মুনাফিকদের আলামত, তাদের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সর্বসম্মুখে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হয়েছে, এ কারণে এ সুরাকে (অপদস্থকারী সুরা)-ও বলা হয়।
জিহাদ এমন এক ইবাদত, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যা সম্পন্ন করতে হয়। উপরন্ত তাবুকযুদ্ধ ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে, তা-ও প্রচণ্ড গরম ও দারিদ্র্যের সময়। তাই যুদ্ধকালে মুনাফিকদের কিছু কিছু কার্যকলাপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে ৷
এগারো পারা শুরুতেও মুনাফিকদের আলোচনা করা হয়েছে। এরপর মুমিনদের নয়টি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রত্যেক মুমিনের থাকা উচিত। এগুলো হলো:
১। তারা তাওবাকারী
২। ইবাদতগুজার
৩। প্রশংসাকারী
৪। রোজাদার
৫। রুকুকারী
৬। সিজদাকারী
৭। ভালো কাজের নির্দেশদাতা
৮। অসৎকাজ থেকে বারণকারী এবং
৯। আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী
যে তিনজন তাবুকযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাবুকযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তাদের মধ্যে তিনজন মুসলমানের ঈমান ও ইখলাসের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না। তারা হলেন :
১. হজরত কা'ব বিন মালেক,
২. হজরত হেলাল বিন উমাইয়া,
৩. হজরত মুরারা বিন রাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
এই তিনজন কোনো ধরনের ওজর পেশ করেননি। বরং পরিষ্কার ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, অলসতা ও ভুলবশত তারা পেছনে রয়ে গিয়েছিলেন। তাদের বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হয়। পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তাদেরকে বয়কট করা হয়। সত্য বলায় ওহীর মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে তাদের তাওবা কবুল করা হয়। এ ঘোষণা তাদের জন্য এতটাই সুসংবাদের কারণ ছিল যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কা'ব বিন মালিককে বলেন, তোমার মা জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ দিনের চেয়ে উত্তম কোনো দিন তোমার জন্য অতিবাহিত হয়নি। ১১৭-১১৮নং আয়াতে তাদের তাওবা কবুল করার বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
সামনের আয়াতে মুমিনদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে:
১. তারা প্রকাশ্যে ও গোপনে তাকওয়া অবলম্বন করবে।
২. মুনাফিকদের থেকে তারা দূরে থাকবে। সত্যবাদীদের সাহচর্য গ্রহণ করবে।
৩. রিজিকের প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুলকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেবে।
৪. বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ওয়াদা। বলা হয়েছে, 'সকল ইবাদতের সাওয়ার আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাওয়া যাবে। এই দীনের জন্য যে পরিমাণ কষ্ট করা হবে, ততই সাওয়ার অর্জিত হবে।
এছাড়া সমস্ত মুসলমান এক সাথে জিহাদে বের না হয়ে দীন শেখার জন্য কিছু লোক থাকা উচিত এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। জিহাদের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি এবং শেষ আয়াতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসার মধ্য দিয়ে সুরা তাওবা শেষ হয়।
বইঃ খোলাসাতুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মর্মকথা)
লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আসলাম শেখোপুরী রহমাতুল্লাহ
অনুবাদঃ মুজাহিদুল মাইমুন
পৃষ্ঠাঃ ১১৪-১২১
Comments
Post a Comment